প্রচ্ছদ > আন্তর্জাতিক >

ইইউতে তালেবান, বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন বাঁক

article-img

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর্মকর্তাদের সঙ্গে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন নেতাদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়ে গেল। এই প্রথমবার আফগানিস্তানের বর্তমান ক্ষমতাসীদের কোনো প্রতিনিধিদল ব্রাসেলসে ইইউর সঙ্গে আলোচনায় বসল।

কূটনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তালেবান ধীরে ধীরে ইউরোপের কূটনীতিতে নিজেদের জায়গা করে নিতে চায়। এজন্য তাদের প্রথম টার্গেট ইউরোপের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে প্রবেশাধিকার বাড়ানো। এ ঘটনায় পশ্চিমা কূটনৈতিক কৌশলে বদল দেখতে পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। 

তারা মনে করছেন, ব্রাসেলসে তালেবানের উপস্থিতি বিশ্ব কূটনীতিতে একটি নতুন বাঁক সৃষ্টির ইঙ্গিত দেয়। বৈঠকে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানে নাগরিকদের ‘মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্ত’ নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পায়। গত ২৩ জুনের ওই বৈঠকটিকে আফগান সরকার 'ঐতিহাসিক' হিসেবে অভিহিত করেছে।   

বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে একটা আস্থা তৈরির পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ইইউতে তালেবানের কূটনৈতিক উপস্থিতিকে খানিকটা ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

ইউরোপী কমিশন সূত্রে জানা যায়, ওই বৈঠকে ইইউর ২৭টি দেশের মধ্যে ১৫ দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত আফগান নাগরিকরা যাতে সহজে দেশে ফিরতে পারেন, সেই প্রক্রিয়া সহজ করতে চান তারা।   

২০২১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর পরাজিত করার পর তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসে। এর পর থেকে তারা নাগরিক অধিকারের ওপর, বিশেষ করে নারী শিক্ষার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। 

ইইউতে তালেবানের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক: ইইউর একটি দেশও তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে তালেবান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। তবে ব্রাসেলসের ওই বৈঠকটি সেই বিচ্ছিন্নতায় একটি ফাটল। 

ক্ষমতায় আসার পর থেকে আফগানিস্তানের নেতারা নীরবে ইউরোপের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে তাদের প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে চলেছে। যদিও ওই বৈঠকের জন্য যে ভিসা পেয়েছিলেন তালেবান নেতারা, সেই ভিসার মেয়াদ ছিল মাত্র ২৪ ঘণ্টা। তাছাড়া সেই ভিসায় অন্য কোথাও যাওয়া নিষেধ ছিল। 

বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রিভো বলেন, তালেবান প্রতিনিধিদের ভিসা দেওয়ার জন্য বেলজিয়াম ইইউর অনুরোধ মেনে চলেছে। বৈঠক করা মানেই তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া নয়। 

ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইইউ দেশগুলোর সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপের জবাবে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। কমিশনের মুখপাত্র মার্কাস ল্যামার্ট বলেন, আফগান নাগরিকদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মানে তালেবানকে স্বীকৃতি নয়। 

বেলজিয়ামের অভিবাসনমন্ত্রী অ্যানলিন ভ্যান বসুইট ওই বৈঠকের আগে বিবৃতি দেন। তাতে তিনি বলেন, আমরা আর স্থবিরতা বজায় রাখতে পারি না। একটি দৃঢ় ও যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। যাতে ইউরোপ অভিবাসন ও নিরাপত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে।

সুযোগ কাজে লাগিয়েছে তালেবান: ইইউ নীতিবিষয়ক গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক ইউরোঅ্যাকটিভ লিখেছে, ইউরোপজুড়ে আফগানদের জন্য কনস্যুলার পরিষেবা পুনরায় চালু করতে ইইউ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই ব্রাসেলস সফরকে কাজে লাগিয়েছে তালেবান। 

তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল কাহার বলখি ইউরোঅ্যাকটিভকে বলেন, ‘ইইউ অঞ্চলে আফগানদের জন্য ব্যাপক পরিসরের কনস্যুলার পরিষেবা পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা বিদেশে বসবাসকারী আফগানদের কনস্যুলার অধিকার সুরক্ষিত করার জন্য একটি ইতিবাচক গতি সঞ্চার করতে চাই।’

অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র বলেন, ইউরোপে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া আফগান নাগরিকদের শনাক্তকরণ, ভ্রমণ নথি প্রদান এবং তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।  

সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফরসেল ইউরো নিউজকে বলেন, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা আফগানরা গুরুতর অপরাধী। সুইডেনে এমন প্রায় ২০০ আফগান নাগরিক নির্বাসনের অপেক্ষায় রয়েছেন।  

ইউরোপের কোন দেশে কতজন আফগান নাগরিক: ইউরোপীয় জাতীয় তথ্য অনুসারে, জার্মানিতে ৪.৩–৪.৫ লাখ, অস্ট্রিয়ায় ৮০-৯০ হাজার, ফ্রান্স ও সুইডেন ৬০-৭০ হাজার, নেদারল্যান্ডসে ৫০-৬০, বেলজিয়ামে ২৫-৩০, নরওয়েতে ২৫-৩০, ডেনমার্কে ২০ হাজারের কাছাকাছি, ফিনল্যান্ডে ১০-১২ হাজার এবং ইতালিতে ২০-৩০ হাজার আফগান নাগরিক রয়েছেন।

এছাড়া যুক্তরাজ্যে ৮০ হাজার থেকে এক লাখের কাছাকাছি আফগান নাগরিক রয়েছেন। যাদের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে নানা অপরাধ কার্যক্রমের প্রমাণ মিলেছে, ইউরোপের সরকারগুলো তাদের ফেরত পাঠানোর চিন্তা করছে। এজন্য তালেবানকে ব্রাসেলসে ডাকে ইইউ। 

কী বলছেন মানবাধিকারকর্মীরা: রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনাকে ইসলামপন্থিদের বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। তবে ইইউ এটিকে ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের প্রত্যাবাসন সহজ করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে সমর্থন করেছে।

তবে ইউরোপের পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আফগান অধিকারকর্মী ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই। ওই বৈঠকের পর তিনি বলেন, ইইউ তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করছে জেনে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। সামাজিক মাধ্যমে এক্সের পোস্টে তিনি লেখেন, ইউরোপের উচিত নয় বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটের জন্য দায়ী একটি শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া। তালেবানের সঙ্গে যে কোনো সম্পৃক্ততা আফগান নারী ও মেয়েদের অধিকারকে কেন্দ্র করেই শুরু এবং শেষ হতে হবে। 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষক ফেরেশতা আব্বাসি মনে করেন, তালেবানের সঙ্গে যে কোনো আলোচনায় মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নির্বাসিত আফগান নাগরিকদের বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না। 

তিনি বলেন, একদিকে ইইউ তালেবানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে জবাবদিহিতা দাবি করছে, অন্যদিকে আফগান নাগরিকদের জোর করে তালেবানের হাতে তুলে দিতে চেয়ে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করছে। 

ইউএনএইচসিআর-এর নীতি উন্নয়ন ও মূল্যায়ন বিভাগের সাবেক প্রধান এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফেলো জেফ ক্রিস্প বলেন, সবচেয়ে স্পষ্ট ও বিপজ্জনক পরিণতি হলো, আফগানদের ইইউ থেকে ফেরত পাঠানো হলে নিজ দেশে তারা তালেবানদের নিপীড়নের শিকার হবে।